অফিস থেকে বেরোনোর সময় আকাশে একটা ভিজে ভিজে গন্ধ ছিল… যেন বৃষ্টি হবে হবে করেও হচ্ছে না। ট্যাক্সির জানলা দিয়ে পার্ক সার্কাসের ট্রাফিকের হর্ন, রিকশার ঘণ্টা, ফুটপাথের মাছওয়ালার হাঁক — সব কিছু কেমন যেন দূরের শব্দ মনে হচ্ছিল। মাথার ভিতর শুধু একটাই কথা ঘুরছিল… রঞ্জিতের শর্তগুলো… সাথে আমি নিজেরও কিছু শর্ত জুড়ে দিলাম। সিনেমা যখন হচ্ছে; চিত্রনাট্য ভেতো বাংলা সিনেমার মতো হলে জমবে না। মোট ছটা শর্ত। ছটা পেরেক।
লিফটে ওঠার সময় নিজের মুখটা আয়নায় দেখলাম। বত্রিশ বছরের একটা লোক, চোখের নিচে হালকা কালি, শার্টের কলার সামান্য কুঁচকে আছে। বাইরে থেকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। ভিতরে… সেটা অন্য গল্প। বুকের বাঁ দিকে একটা চাপা টান, হাতের তালু ঘামছে। মাসের পর মাস যে লোকটা বিছানায় নিজের বউয়ের সামনে নিজেকে ব্যর্থ প্রমাণ করেছে, সে-ই এখন এই সিদ্ধান্তটা কার্যকর করতে যাচ্ছে। মজার ব্যাপার… এই মুহূর্তে আমার নার্ভাসনেসটা যৌবনের প্রথম রাতের মতো। শুধু আজকের রাতে আমি কিছু করব না। আমি শুধু কথা বলব।
দরজার তালা খুলতে গিয়ে চাবিটা দুবার পড়ে গেল। ভিতর থেকে হলুদ গুঁড়ো আর সরষের তেলের গন্ধ ভেসে আসছিল… রুখসানা মাছ ভাজছে। ঘি-জিরার সঙ্গে মিশে একটা পুরনো, পরিচিত গন্ধ… যে গন্ধে চার বছর আগে বিয়ের পর প্রথম মাসে আমার মনে হত ঘরটা সত্যিই আমার হয়েছে। আজ সেই গন্ধটাই কেমন যেন গলার কাছে আটকে গেল।
“এসে গেছ?” রান্নাঘর থেকে ওর গলা। স্বাভাবিক। একটু ক্লান্ত, একটু বিরক্ত… গত সাত-আট দিনের সেই একঘেয়ে গলা।
“হুঁ।”
আমি সোফায় বসলাম না। জুতো খুলে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকলাম। মুখে জল দিলাম চার-পাঁচ বার। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বললাম… “করিম, একবার বললেই হবে। একবার। তারপর বাকি কাজটা রঞ্জিত করবে।” ভিজে মুখটা তোয়ালেতে মুছলাম। হাতটা এখনও কাঁপছে সামান্য।
বেরিয়ে দেখলাম ও ডাইনিং টেবিলে প্লেট সাজাচ্ছে। পরনে সেই হালকা গোলাপি সালোয়ার-কামিজ, চুল একটা আলগা খোঁপায় বাঁধা, ঘাড়ের কাছে দু’-একটা ভিজে ছোট চুল লেপ্টে আছে। রান্নার তাপে গালটা লালচে। কপালের সিঁদুর… না, সিঁদুর নেই। মুসলিম, সিঁদুর পরে না। এই কথাটা মাথায় আসতেই পেটের ভিতর কেমন একটা কামড় দিল, কারণ কাল-পরশু থেকে ওকে সিঁদুর পরতে হবে। এই শর্তটা আমি রঞ্জিতের শর্তের সাথে যোগ করেছিলাম…
“খাবে না?”
“একটু পরে। কথা আছে।”
ও প্লেট রাখতে রাখতে থামল। মুখ তুলে তাকাল। ওর চোখদুটো… কাজলহীন, একটু ফোলা, কিন্তু এখনও সেই পুরনো তীক্ষ্ণতা আছে। যে চোখদুটো আমি বিয়ের আগে ছবিতে দেখে ভেবেছিলাম এই মেয়েটা কিছু লুকোতে পারেনা।
“বলো।”
গলাটা শুকিয়ে গেছে। একবার ঢোঁক গিললাম।
“বসো।”
“দাঁড়িয়েই শুনি। কী বলবে?”
আমি সোফায় বসলাম। ও দাঁড়িয়ে রইল, হাতে ন্যাকড়া, আঙুলে হলুদের দাগ।
” অনেক ভাবলাম বুঝলে। তাছাড়া লোক জানাজানির ভয় তো আছেই… আমাদের অফিসের ওয়াচম্যান রঞ্জিত সব থেকে সেফ আমাদের জন্য… ওর সঙ্গে ফাইনাল কথা হয়ে গেছে…”
শব্দটা মুখ দিয়ে বেরোনোর পর ঘরটা যেন এক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল। রান্নাঘরে গ্যাসের হালকা শোঁ শোঁ, বাইরে কারো বাচ্চার কান্না, উপরতলার ফ্ল্যাটে চেয়ার টানার শব্দ… সব শুনতে পাচ্ছি অথচ কোনোটাই যেন এই ঘরের না।
ও ন্যাকড়াটা টেবিলে রাখল। ধীরে। “কী বলেছে?”
“শর্ত দিয়েছে।”
“শর্ত?” ঠোঁটের কোণায় একটা তেতো হাসি। “শর্ত আবার কী শর্ত, শলা ও তো ছোটলোক? ও তো… ও তো একটা…”
“শোনো আগে।”
আমি চোখ নামালাম। কার্পেটের একটা সুতো বেরিয়ে আছে। সেটার দিকে তাকিয়ে বললাম…
“এক– ও কোনো কনডম ব্যবহার করবেনা। প্রতিবার ভিতরে ফেলবে।”
ও কিছু বলল না। শুধু একটা ছোট্ট শ্বাস…যেন কেউ পেটে ঘুষি মেরেছে।
“দুই- সময় ও ঠিক করবে। কখন আসবে, কতক্ষণ থাকবে। কী করবে।”
“তিন – কাপড় ও ঠিক করবে। কী পরবে, কী পরবে না।”
“চার – আমি পুরোটা রেকর্ড করব। ক্যামেরায়। আমার নিজের জন্য, পরে দেখার জন্য।”
“পাঁচ- আমি শুধু দেখব। কোনো কথা বলব না, কিছু করব না।”
পরবর্তী শর্তটার আগে একটু থামলাম। এটা সবচেয়ে জরুরি।
“ছয়- তুমি ওকে বলবে না যে তুমি পিল খাচ্ছ। ও যেন ভাবে… ও যেন ভাবে ও তোমাকে পোয়াতি করছে প্রতিবার…”
এবার মুখ তুললাম। ওর মুখটা ফ্যাকাশে। ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক। চোখে জল না… বিস্ময়। যেন এইমাত্র শোনা কথাগুলো ঠিক ওর ভাষায় অনুবাদ হচ্ছে না।
তারপর বিস্ফোরণ।
“তুমি পাগল হয়ে গেছ?” গলাটা প্রথমে ফিসফিস, তারপর চড়ে গেল। “তুমি জানো ও কে? ওই… ওই দারোয়ানটা? যে সারাদিন ঘামে ভেজা গেঞ্জি পরে গেটে বসে থাকে? যার দাঁতে পান খাওয়া দাগ? ওই লোকটা আমার শরীরে হাত দেবে? প্রোটেকশন ছাড়া? আবার ভিতরে ফেলবে? ছিঃ করিম ছিঃ!!”
আমি চুপ।
“আর ধর্ম? তুমি একজন মুসলিম হয়ে … একজন মুসলিম মেয়েকে — একটা হিন্দু, নিচু জাতের, জেলখাটা লোকের কাছে …”
“কামলি …” আমি শুরু করেছিলাম।
“কামলি কে? ওই ঝি? ওকে যেভাবে ব্যবহার করে সেটা তুমি নিজে চোখে দেখেছ, তাই না? তুমি চাও আমি সেই মেয়েটার জায়গায়…”
ওর গলা ধরে এল। কিন্তু কাঁদল না। এটা আমি লক্ষ্য করলাম। আমার বউ যখন সত্যি কষ্ট পায়, ও কাঁদে। এই মুহূর্তে ও কাঁদছে না। ও রাগ দেখাচ্ছে।
আর সেই রাগের সুরটা… কীভাবে বলি… সেই সুরটা আমি আগে শুনেছি। ঠিক সাড়ে তিন বছর আগে, বিয়ের ঠিক পর পর, যখন ওর ফোনে একজনের মেসেজ নিয়ে আমি প্রশ্ন করেছিলাম… সেদিনও ও ঠিক এইভাবে রাগ দেখিয়েছিল। ঠিক এই কম্পন…ঠিক এই ভাবেই…
মনে মনে নোট করলাম- রুখসানার বিরক্তিটা একটু বেশি সাজানো। যেন তার ভিতরে কোথাও একটা কণ্ঠস্বর বলছে, ‘অভিনয়টা ঠিকমতো করো, নইলে ধরা পড়ে যাবে।’
কিন্তু মুখে কিছু বললাম না। এই তথ্যটা আজকের রাতের জন্য না। এই তথ্যটা অনেক পরের জন্য।
“রুখসানা, বসো।”
“বসব না।”
“যা বলার শেষ হয়নি।”
ও দাঁড়িয়েই রইল, হাতদুটো বুকের সামনে জড়ানো, বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। কামিজের কাপড় প্রতিটা শ্বাসের সঙ্গে টানটান হয়ে ফুলে উঠছে, আবার নামছে। মাসের পর মাস যে শরীরটার দিকে আমি অন্ধকারে অক্ষম হয়ে তাকিয়ে থেকেছি, আজ সেটাকেই আমি অন্য একজনের হাতে তুলে দেওয়ার শর্ত পড়ে শোনাচ্ছি।
আশ্চর্যের ব্যাপার… এই মুহূর্তে আমার বাঁড়াতে সামান্য চাপ অনুভব করলাম। মাসের পর মাস মরে থাকা মাংসটা, ঠিক এই মুহূর্তে, ওর অপমান শুনে, সামান্য নড়ে উঠল।
আমি কিছু বললাম না। শুধু মনের ভিতরে একটা লাইন লিখে রাখলাম, পরে ভাববার জন্য…
‘এটাই কি তাহলে আমার অসুখের ওষুধ? ওর ধ্বংস?’
ঘরের হলুদ আলোয় ওর ছায়াটা দেয়ালে পড়েছে … লম্বা, কাঁপা কাঁপা, একটু সামনে ঝুঁকে। বাইরে কোথাও একটা কুকুর ডাকল। রান্নাঘরে গ্যাসটা এখনও জ্বলছে, মাছের তেল ফুটছে টগবগ করে… কেউই মনে করে গ্যাসটা বন্ধ করতে যায়নি। সেই পোড়া সরষের গন্ধটা এখন ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে, একটু তেতো, একটু ঝাঁঝালো…
“গ্যাসটা…” আমি বললাম…
ও চমকে উঠল, যেন আমার গলাটা ভুলে গিয়েছিল। ছুটে রান্নাঘরে গেল, সপ্তম শর্ত না শুনেই… কড়া নামানোর ধাতব শব্দ, জল ঢালার শোঁ শোঁ, তারপর দীর্ঘ নীরবতা। ফিরল না সঙ্গে সঙ্গে। আমি জানি ও ওখানে সিঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, দুই হাতে বেসিনের কিনারা ধরে, মাথাটা নিচু করে। হয়তো চোখে জল আসছে, বা হয়তো আসছে না। এই মুহূর্তটা ওর নিজের সঙ্গে ওর নিজের বোঝাপড়ার মুহূর্ত। আমি ঢুকব না…
মিনিট চারেক পর ও ফিরল। এবার হাতে ন্যাকড়া নেই। শুধু আঁচলটা কোমরে গুঁজে নিয়েছে। মুখটা ধোয়া, চোখ লাল কিন্তু শুকনো।
“রেকর্ড করবে কেন?”
গলাটা এখন অন্যরকম। রাগ নেই, কান্না নেই। শুধু একটা ঠান্ডা প্রশ্ন। আমি বুঝলাম …সবচেয়ে বিপজ্জনক সুর এটাই। যখন মানুষ শর্ত মানার আগে খুঁটিনাটি জানতে চায়, তখন বুঝতে হবে ভিতরে ভিতরে সে হিসেব করছে।
“আমার জন্য।”
“তোমার জন্য মানে?”
“আমি পরে দেখব। একা।”
ও একটু চুপ করে থাকল। তারপর …”তুমি আমাকে দেখে… উত্তেজিত হবে? একটা বেজাতের ছোটলোক তোমার বউকে লাগাবে; আর তুমি সেই ভিডিও দেখে খেচবে!!”
শব্দটা মুখ থেকে বেরোনোর সময় ওর গলা কাঁপল একটু। “উত্তেজিত” শব্দটা ও কোনোদিন এভাবে বলেনি আমার সামনে। এতো নোংরা ভাষায় আমার সামনে কোনোদিন কথা বলেনি। আমাদের বিছানায় সবসময় ইঙ্গিত, সবসময় ঘুরিয়ে বলা। আজ প্রথম সরাসরি।
“হ্যাঁ।”
আরেকটা নীরবতা। এবার লম্বা।
“সিঁদুর?” ও হঠাৎ বলে উঠল। “মঙ্গলসূত্র? এগুলো তো তুমি বলোনি এখনও। এবার এটাও বলে দাও যে এগুলো ও রঞ্জিতের শর্তে ছিল?”
আমি ভ্রু কুঁচকালাম… “তুমি জানলে কীভাবে?”
ও থমকে গেল। এক সেকেন্ডের জন্য চোখ সরিয়ে নিল। তারপর সামলে নিল …”অনুমান করলাম। ও হিন্দু, নিচু জাতের, জেলখাটা… এমন লোক শুধু শরীর চায় না, ও একজন মুসলিম বউকে হিন্দুর চিহ্ন পরিয়ে দেখতে চাইবে। এটা তো সোজা হিসেব।”
মনে মনে আমি আবার নোট করে রাখলাম… অনুমানটা একটু বেশি সঠিক। যেন আগে কোথাও শুনেছে বা পড়েছে। অথবা কল্পনা করেছে। এই ধরনের কল্পনা এমনি এমনি আসে না যদিও…
যদিও শর্ত টা আমার কিন্তু মুখে বললাম… ” হ্যাঁ। ও এটাই চাইবে। কাল-পরশু থেকে তোমাকে সিঁদুর পরতে হবে। মঙ্গলসূত্র। ওর সামনে যতক্ষণ, ততক্ষণ। বাইরে বেরোনোর সময় খুলে ফেলবে। বা অন্য সময় ঘরেও ওসব ভুলভাল জিনিস পরার দরকার নেই…”
ও চোয়াল শক্ত করল। “একজন মুসলিম মেয়ে সিঁদুর পরবে… একজন বজ্জাত ছোটলোকের জন্য…”
“তুমি রাজি না হলে বলে দাও এখনই।”
শব্দগুলো নিজের মুখ থেকে বেরোনোর পর আমার নিজেরই অদ্ভুত লাগল। এই এক লাইনে আমি সবকিছু ওর কাঁধে চাপিয়ে দিলাম। এখন যদি ও “না” বলে, তাহলে ব্যর্থতাটা ওর। আর আমার… কেঁচে গণ্ডুষ। আর যদি “হ্যাঁ” বলে… তাহলে বাকিটা ইতিহাস।
ও দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ওঠানামাটা এখন ধীর হয়ে এসেছে। কামিজের নিচে ব্রেসিয়ারের হুকের একটা হালকা ছাপ কাপড়ের উপর দিয়ে বোঝা যাচ্ছে। ঘামে ভিজে কামিজটা বুকের কাছে একটু চিটে গেছে। আমি এই ডিটেলগুলো লক্ষ্য করছি… আজ প্রথম, খুব ঠান্ডা মাথায়, যেন অন্য কারো বউকে দেখছি।
“রঞ্জিতকে আমার ছবি দেখিয়েছ?”
“হ্যাঁ।”
“কোন ছবি?”
“আমাদের বিয়ের প্রথম রাতে তোলা একটা। শাড়িতে।”
ও ঠোঁট কামড়াল। “কী বলেছে?”
আমি একটু ইতস্তত করলাম। তারপর সরাসরি বললাম… “বলেছে ‘সাহেবের বৌ। বড় ঘরের মাল। এবার আমার তলায় শুয়ে চিৎকার করবে। আমার ছাওয়াল পেটে ধরবে…’
শব্দগুলো পুরোটা রঞ্জিতের ছিল না। শেষ অংশটা আমি যোগ করেছি। ইচ্ছে করে। এই মুহূর্তে ওর মুখে যে রিঅ্যাকশনটা আসবে সেটা আমার জানা দরকার।
ও কেঁপে উঠল। চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য। কিন্তু কেঁপে ওঠার আগে… ঠিক আগের সেকেন্ডে… আমি ওর নিঃশ্বাসটা একটু আটকে যেতে দেখলাম। বুকটা ফুলে উঠল, তারপর হঠাৎ থেমে গেল। যেন শরীরটা মাথার আগেই কিছু বুঝে ফেলেছে।
‘এটা ভয় না। এটা অন্য কিছু। এটাকে আমি চিনি।’
“রুখসানা।”
“হুঁ।”
“হ্যাঁ, না… কী…?”
ও চোখ খুলল। এবার আমার দিকে সোজা তাকাল। ওর চোখে এখন একটা অদ্ভুত ভাব …যেন একজন মানুষ পাহাড়ের কিনারা থেকে নিচে তাকাচ্ছে, আর নিচে তাকাতে গিয়ে টের পাচ্ছে যে তার ভিতরে ঝাঁপ দেওয়ার একটা ইচ্ছেও আছে।
“আমি… আমি একটু ভাবব।”
“কতক্ষণ?”
“আজ রাত।”
“ঠিক আছে।”
আমি উঠে দাঁড়ালাম। ওর পাশ কাটিয়ে বেডরুমের দিকে গেলাম। যাওয়ার সময় ওর গা থেকে একটা মিশ্র গন্ধ পেলাম… নারকেল তেল, ঘাম আর নিচে কোথাও একটা হালকা মিষ্টি গন্ধ, যেটা মেয়েদের শরীর থেকে আসে যখন তারা কিছু একটা ভিতরে ভিতরে টের পায় অথচ স্বীকার করতে চায় না।
বেডরুমে ঢুকে দরজাটা ভেজিয়ে রাখলাম। পুরো বন্ধ না। ফাঁক দিয়ে ডাইনিং টেবিলের এক কোনা দেখা যাচ্ছে।
আমি বিছানায় বসলাম। শার্টের বোতাম খুললাম একটা একটা করে। প্যান্টের বেল্ট খুললাম না। শুধু বসে রইলাম, কান খাড়া করে।
দশ মিনিট পর রান্নাঘরে জলের কল খোলার শব্দ। থালা ধোয়ার শব্দ। আরও দশ মিনিট পর ও বাথরুমে ঢুকল। বাথরুমের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা আজ একটু জোরে হল। ইচ্ছাকৃত না, কিন্তু ভিতরের অস্থিরতাটা ওই শব্দে প্রকাশ পেল।
বাথরুমে জল পড়ছে অনেকক্ষণ ধরে। অস্বাভাবিক অনেকক্ষণ। কখনো কখনো জল থামে, আবার শুরু হয়। মাঝখানে একটা ছোট্ট শব্দ… হয়তো ও বসে পড়েছে বাথরুমের মেঝেতে, হয়তো কমোডের ঢাকনার উপর। জানি না। আমি শুধু শুনছি।
শেষে যখন ও বেরোলো, চুল ভিজে, গায়ে পাতলা সুতির নাইটি… সেটা এমন এক নাইটি যেটা ও সাধারণত পরে না গরমকালেও, কারণ কাপড়টা খুব পাতলা, মাইয়ের বোঁটার আকার স্পষ্ট বোঝা যায়। আজ পরেছে।
‘এটা কি ভুল করে? না কি ভিতরে ভিতরে ও আমাকে দেখাতে চাইছে…’
ও বেডরুমে ঢুকল না। সোফায় গিয়ে বসল। ফোনটা তুলল। আমি দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলাম …ও গ্যালারিতে ঢুকল। পুরনো ছবি দেখছে। বিয়ের ছবি। হানিমুনের ছবি। আঙুলটা স্ক্রিনে খুব ধীরে ধীরে চলছে।
আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম। রাত ৯:০৩।
সাত ঘণ্টা বাকি। সকালের নামাজের আগে ও আমাকে উত্তর দেবে। আমি জানি ও দেবে। কারণ যে মেয়ে আজ রাতে ওই নাইটিটা পরেছে, সে সিদ্ধান্ত আগেই নিয়ে ফেলেছে। শুধু সাত ঘণ্টা সময় নিচ্ছে নিজেকে বোঝানোর জন্য যে সিদ্ধান্তটা ওর নিজের না, আমার চাপের।
আমি বালিশে হেলান দিয়ে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকালাম। ফ্যানটা একটু কাঁপছে ঘুরতে ঘুরতে। প্রতিটা ঘূর্ণনের সঙ্গে একটা ক্লিক ক্লিক শব্দ… দুবছর ধরে ঠিক করাচ্ছি করাচ্ছি করে করানো হয়ে ওঠেনি।
‘এই ফ্ল্যাটে যা যা ভাঙা আছে, আজ থেকে সেগুলো একে একে ভাঙতেই থাকবে। আমি কিছু ঠিক করতে যাব না।’
ফজরের আজানের ঠিক আগের সেই নীল অন্ধকারে আমার ঘুম ভাঙল। আজানের ডাকটা ভেসে এল দূরের মসজিদ থেকে। “আসসালাতু খায়রুম মিনান নাউম…”- নামাজ ঘুমের চেয়ে ভালো। কী বিদ্রূপ। এই বাড়িতে আজ কেউ নামাজে দাঁড়াবে না।
বেডরুমের দরজাটা এখনও ভেজানো… যেভাবে রেখেছিলাম। বাইরে থেকে কোনো শব্দ নেই। সিলিং ফ্যানের ক্লিক ক্লিক আওয়াজটা ছাড়া আর কিছুই না।
উঠে বসলাম। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। রান্নাঘরে গিয়ে জল খেতে গিয়েই থমকে গেলাম… ও সোফায় শুয়ে আছে। বেডরুমে আসেনি সারা রাত। পাতলা সুতির নাইটিটা হাঁটুর উপর উঠে গেছে, একটা পা সোফা থেকে ঝুলছে, বুকের কাছে ওড়নাটা কোনোরকমে জড়ানো। ঘুমিয়েছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। মুখের একদিকে বালিশের চাপ, চোখের নিচে গতকালের চেয়ে গাঢ় কালি।
ফোনটা বুকের উপর উপুড় করা। স্ক্রিন এখনও হালকা জ্বলছে।
আমি এগিয়ে গেলাম। ধীরে ধীরে ফোনটা তুলে নিলাম ওর বুকের উপর থেকে। ও নড়ল না। শ্বাসটা গভীর, কিন্তু একটু বেশি গভীর… যেন ঘুমের অভিনয় করছে।
স্ক্রিনটা উল্টে দেখলাম। গ্যালারি খোলা। সবচেয়ে শেষের ছবিটা… বিয়ের রাতে তোলা একটা সেলফি। ওর কপালে তখন হলুদের হালকা দাগ, ঠোঁটে লিপস্টিক ঘষে ঘষে ছড়িয়ে গেছে, চোখে সেই লজ্জাটা যেটা আজ আর নেই।
‘এই ছবিটা ও কেন দেখছিল ঘুমের আগে? বিদায় জানাচ্ছিল? না, বিদায় না। ও নিজেকে মনে করাচ্ছিল — “আমি এই মেয়েটাই ছিলাম।” যেন কালকে যে মেয়েটা রঞ্জিতের সামনে দাঁড়াবে, সে অন্য কেউ।
ফোনটা যেভাবে ছিল সেভাবে রেখে দিয়ে বাথরুমে গেলাম।
বাথরুমের বিনটা… সেই সাদা প্লাস্টিকের ছোট ডাস্টবিন… খুললাম। উপরে টয়লেট পেপার, তার নিচে একটা ভাঁজ করা টিস্যু, তার নিচে যা আমি খুঁজছিলাম। একটা খালি ব্লিস্টার প্যাক। রূপালী রঙের ফয়েল। একুশটা ঘরের মধ্যে একটা খালি। “Unwanted-21 Days”…ছোট ছোট অক্ষরে ছাপা।
হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখলাম। ফয়েলটা যেভাবে ছিঁড়েছে সেটাও দেখলাম … একটু তাড়াহুড়ো করে, দুই আঙুলের নখ দিয়ে। মেঝেতে বসে খেয়েছে সম্ভবত, কারণ পাশে জলের একটা ছোট দাগ শুকিয়ে আছে।
‘ লং স্টোরি শর্ট – ও একটা পিল অলরেডি খেয়েছে। মানে সিদ্ধান্তটা কালই নিয়ে নিয়েছে। যখন আমি শর্তগুলো বলছিলাম, তখন ওর মুখ যা বলছিল আর ভিতরে যা চলছিল… দুটো আলাদা নদী।’
আমি ভিতরে ভিতরে হাসলাম। মুখে না, পেটের ভিতরে। যে মেয়েটা এখনও “হ্যাঁ” শব্দটা মুখে বলেনি, সেই মেয়েটা আজানের সঙ্গে সঙ্গে গর্ভনিরোধক বড়ি গিলছে। উত্তরটা এসে গেছে। শুধু আনুষ্ঠানিকতাটা বাকি।
ব্লিস্টারটা যেভাবে ছিল সেভাবে রেখে দিলাম। টিস্যু চাপা দিলাম। উপরে টয়লেট পেপার। ঢাকনা বন্ধ।
আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। মুখে জল দিলাম। ভিতরে একটা লাইন উঠে এল, লিখে নেওয়ার মতো…
“ও এখনও একটা দরজা বন্ধ রাখতে চাইছে। ওর গর্ভ। শরীরটা দেবে, চাবিটা রাখবে নিজের কাছে। এটাই ওর শেষ প্রতিরোধ। আমি এটা ভাঙব না… এখনও না। এটা রঞ্জিত ভাঙবে, নিজের অজান্তেই। ও ভাববে ও পোয়াতি করছে, আসলে ও শুধু বীর্য ঢালছে একটা তালাবন্ধ ঘরে। এই না-জানাটাই তো ওর অপমানের সবচেয়ে মজার অংশ।”
বেরিয়ে এসে দেখি ও উঠে বসেছে। চুল এলোমেলো, নাইটির একটা কাঁধ সরে গেছে, ব্রেসিয়ারের কালো ফিতেটা দেখা যাচ্ছে। মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল।
“হ্যাঁ।”
শুধু একটা শব্দ। জোরে না, ফিসফিস না। মাঝামাঝি একটা গলা।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।
“হ্যাঁ, রাজি। যা যা শর্ত বলেছ, সব।”
মাথা নাড়লাম একবার। কিছু বললাম না। এই মুহূর্তে বেশি কথা মানে ওকে পিছিয়ে যাওয়ার একটা ফাঁক দেওয়া।
ও উঠে দাঁড়াল। নাইটির কাঁধটা ঠিক করল না। রান্নাঘরের দিকে হেঁটে গেল। যাওয়ার সময় পাছার দোলটা… গতকালের চেয়ে অন্যরকম। একটু ধীর, একটু বেশি সচেতন। যেন ও-ও জানে আজ থেকে ও কীভাবে হাঁটে সেটাও একটা তথ্য।
আমি ডাইনিং টেবিলে বসলাম। ও চায়ের কাপটা আমার সামনে রাখল। রাখার সময় ওর হাতের কাঁপুনিটা এত হালকা যে না দেখলে বোঝা যায় না। আমি দেখলাম। কাপটা রেখে ঘুরে চলে গেল রান্নাঘরে।
আমি চায়ে চুমুক দিলাম। চিনি একটু বেশি হয়েছে আজ। ও যখন উত্তেজিত থাকে বা মন খারাপ থাকে, চিনি বেশি দেয়। এটা আমি বিয়ের ছমাসের মধ্যেই ধরে ফেলেছিলাম।
‘ পিল কাজ করতে সাত দিন লাগে। ও জানে। মানে ও সাত দিন সময় নিচ্ছে। মানে রঞ্জিতকে বলবে “এক সপ্তাহ পর।” আমি অপেক্ষা করব। সাত দিনে অনেক কিছু ঘটতে পারে ফোনে।’
পরের সাতটা দিন আমি অফিসে বেশি সময় কাটালাম। রুখসানার ফোন নম্বর আগেই দিয়ে দিয়েছিলাম রঞ্জিতকে। তাই ইচ্ছে করেই ওকে একা ছাড়লাম ফোনের সঙ্গে।
তৃতীয় দিনে বাড়ি ফিরে দেখি ওর ফোন চার্জে বসানো, ব্যাটারি সাত পার্সেন্ট। সকালে বেরোনোর সময় ছিল আটানব্বই। মানে সারাদিন ফোন হাতে। মানে রঞ্জিত টেক্সট করছে।
পঞ্চম দিনে বাথরুমে ঢুকে খেয়াল করলাম ওর ব্যবহার করা তোয়ালেটা একটু বেশি ভিজে। মাঝখানে না, নিচের অংশে। বসে বসে ধুয়েছে অনেকক্ষণ।
সন্ধ্যাবেলা স্নান করে না ও কোনোদিন। আজ করেছে। মানে দুপুরে বা বিকেলে কিছু একটা হয়েছে যেটা ধুয়ে ফেলতে হয়েছে।
ষষ্ঠ দিন রাতে ওকে দেখলাম বেডরুমের দরজা ভেজিয়ে ভিতরে ফোন নিয়ে বসে আছে। ছবি তুলছে। ফ্ল্যাশ জ্বলছে দু’-এক সেকেন্ড অন্তর। আমি বাইরে থেকে সরে এলাম। শুনলাম না, দেখলাম না। শুধু পরদিন সকালে যখন ও গ্যালারি ঘেঁটে কিছু ছবি “Recently Deleted” এ পাঠাচ্ছিল, আমি চোখের কোণা দিয়ে দেখে নিলাম… একটা ছবিতে ও ব্লাউজ ছাড়া দাঁড়িয়ে, দু’হাতে বুক ঢাকা, কিন্তু পুরোটা না। আর একটা ছবিতে… শুধু কোমরের নিচের অংশ। সিঁথিতে সিঁদুর। এখনও সিঁদুর কেনেনি বলেছিল। মিথ্যে বলেছিল। কিনেছে, লুকিয়ে রেখেছে, শুধু ছবির জন্য পরেছে।
রঞ্জিত জিতে গেছে প্রথম রাউন্ডে। ও নিজেই এখন হিন্দুর চিহ্ন পরে ছবি তুলছে, যাতে ওই লোকটা খুশি হয়।
সপ্তম দিন গভীর রাতে জল খেতে উঠে দেখি বাথরুমের দরজার তলা দিয়ে আলো আসছে। কল বন্ধ, কিন্তু ভিতরে চাপা একটা শব্দ … নিঃশ্বাসের। দ্রুত, ছোট ছোট, তারপর হঠাৎ একটা লম্বা টানা শ্বাস, তারপর নিস্তব্ধতা। আমি সরে এলাম।
বেডরুমে ফিরে বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ফ্যানটা এখনও কাঁপছে ক্যাচ ক্যাচ শব্দে।
ও আর ভয় পাচ্ছে না। ও এখন চাইছে।
অষ্টম দিন সন্ধ্যায় ও আমার কাছে এল। হাতে ফোন। স্ক্রিন অফ। মুখটা ফ্যাকাশে, কিন্তু চোখদুটোয় সেই পাহাড়ের কিনারার ভাব… যেটা আমি প্রথম দিন নিকাহ-র রাতে দেখেছিলাম।
“করিম।”
“হুঁ।”
“একটা কথা জিজ্ঞেস করব।”
“বলো।”
ও ঠোঁট ভিজিয়ে নিল। কামিজের হাতাটা টেনে টেনে আঙুলে গোল করছে।
“কেউ জানবে না তো? শুধু আমরা তিনজন? যদি কোনো আত্মীয় বা বন্ধু জানতে পারে…?”
“বাহ। প্রশ্নটা “আমি করব কি করব না” না। প্রশ্নটা “লোকে জানবে কি না।” মানে সিদ্ধান্ত শেষ। শুধু কভার খুঁজছে।”
আমি বুঝলাম… কাস্টিং সম্পূর্ণ।
ঠিক সাড়ে তিন বছর আগে ফোনের মেসেজ নিয়ে আমি যখন জিজ্ঞেস করেছিলাম, তখনও ওর প্রথম প্রশ্ন ছিল… “তুমি কি বাড়িতে বলবে?” অর্থাৎ একই মেয়ে, একই হিসেব, সাড়ে তিন বছর পর।
আমি ওর মুখের দিকে তাকালাম। ঠান্ডা চোখে। শার্টের কলার ঠিক করলাম একবার। গলাটা একটু নামিয়ে, ঠিক সেই টোনে যেটা অফিসে বড় ডিলের শেষে ব্যবহার করি…
“রুখসানা, বিগত তিন বছর ধরে কোম্পানির রিজিওনাল মার্কেটিং হেড আমি। পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য তৈরি কোনো মার্কেটিং ড্রাফট আমার সই ছাড়া অ্যাপ্রুভ হওয়ার সুযোগ নেই। অফিসে সবাই আমার প্ল্যানিংকে একদম পারফেক্ট বলে। আমি নিজেও তাই মনে করি। একটা কথা সব সময় মনে রাখবে- করিম আহমেদের সিনেমায় রোল বদলাতে পারে, কিন্তু কাস্টিং কখনো ভুল হয় না।”
ও একটু ঝুঁকে পড়ল সামনে। যেন কথাটা ঠিকমতো শুনতে পায়নি। তারপর সোজা হল। ঠোঁটের কোণায় একটা ছোট, বাঁকা হাসি… ভয়ের না, স্বস্তির না, অন্য কিছুর। যেন ও-ও এইমাত্র বুঝল যে ও একটা স্ক্রিপ্টের ভিতর ঢুকে পড়েছে, আর স্ক্রিপ্টটা এখনও ইনকমপ্লিট…
ফোনটা ও টেবিলে রাখল। স্ক্রিন উপরের দিকে। ঠিক তখনই একটা মেসেজ এল। ভাইব্রেশনটা কাচের টেবিলে ঘষে একটা লম্বা শব্দ তুলল।
আমি চোখ নামালাম না। ও-ও না।
আমরা দুজনেই ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইলাম, যতক্ষণ না স্ক্রিনটা আবার নিভে গেল।
(চলবে)
বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রাপ্তবয়স্ক টেলিগ্রাম গ্রুপে যুক্ত হয়ে খুঁজে নিন নিজের সেক্স পার্টনার এবং হাজার হাজার ভাইরাল ভিডিও উপভোগ করুন।🔞 এখানে ক্লিক করুন


অনেক সুন্দর হয়েছে গল্পটা আরো অনেক পার্ট চাই। লেখকের কাছে বিনীত আবেদন
গল্পের কাঠামো আগে থেকেই নির্ধারিত। নিশ্চিন্ত থাকুন, এটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে।
next part kobe ashbe?